স্কুল না বিশ্রামঘর? ক্লাস চলাকালীন খুদে পড়ুয়াদের দিয়ে ম্যাসাজ করানোর অভিযোগে তীব্র বিতর্কে প্রধান শিক্ষিকা
উত্তরপ্রদেশের চিত্রকূট জেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে ভাইরাল হওয়া ভিডিও নতুন করে তুলেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে বড় প্রশ্ন। অভিযোগ, স্কুল চলার সময় ক্লাসরুমেই শুয়ে থেকে পড়ুয়াদের দিয়ে হাত-পা ও কোমরে মালিশ করাচ্ছিলেন প্রধান শিক্ষিকা।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের চিত্রকূট জেলার করভী এলাকার নয়া বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মধু কুমারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে ঘিরে এলাকাজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল শোরগোল।
ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ক্লাসরুমের মেঝেতে চটাই পেতে শুয়ে আছেন প্রধান শিক্ষিকা। তাঁর চারপাশে দাঁড়িয়ে ছোট ছোট স্কুল পড়ুয়ারা হাত, পা ও কোমরে মালিশ করছে। শুধু হাত-পা টেপানোই নয়, একটি বেলন ব্যবহার করে কোমর ও পিঠেও চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে ভিডিওতে দেখা যায়। পড়ুয়াদের অনেকেই তখনও স্কুল ইউনিফর্ম পরে রয়েছে, অর্থাৎ এই ঘটনাটি স্কুল চলাকালীন সময়েই ঘটেছে বলেই অভিযোগ।
ঘটনাটিকে ঘিরে ক্ষোভের বড় কারণ হল, এখানে শিশুরা ছাত্র হিসেবে নয়, বরং যেন ব্যক্তিগত সেবাদাতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে— এমন অভিযোগই উঠছে বিভিন্ন মহলে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় এমন আচরণ কেবল অশোভনই নয়, তা শিশুদের মানসিক অবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত অনেকের।
ভিডিওতে কী দেখা গিয়েছে
- ক্লাসরুমের মেঝেতে শুয়ে বিশ্রাম নিতে দেখা যায় প্রধান শিক্ষিকাকে।
- চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পড়ুয়ারা তাঁর হাত, পা ও কোমরে মালিশ করছে।
- একটি বেলন দিয়ে পিঠ ও কোমরের অংশে চাপ দেওয়ার দৃশ্যও ধরা পড়েছে।
- ঘটনার সময় বহু ছাত্রছাত্রী স্কুল ইউনিফর্ম পরে ছিল, যা স্কুল চলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
- ভিডিওতে প্রধান শিক্ষিকাকে নির্দেশ দিতে ও আরাম করতে দেখা যায়।
শোনা গিয়েছে কী বক্তব্য
ভিডিওতে প্রধান শিক্ষিকা মধু কুমারীকে হিন্দিতে একাধিক মন্তব্য করতে শোনা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়—
“আরে বেটা, জোর-জোর লাগাও… হাঁ এই তরফ থেকে… উপর থেকে নিচে পর্যন্ত ভালো করে দবাও… আহা! কিতনা মজা আ রহা হ্যায়… থোড়া আর জোর লগাও বেটি… হাঁ, তুম তো বড়িয়া মালিশ করতি হো… এই দিকও আরেকটু… ওহো! বাহুত আরাম মিল রহা হ্যায়!”
ভাইরাল ভিডিওতে শোনা যাওয়া বক্তব্য
বাংলা অর্থ
“বাবু, জোরে জোরে চাপ দাও… হ্যাঁ, এদিক থেকে… উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ভালো করে চাপো… আহ্! কী দারুণ মজা লাগছে… একটু আরও জোর দাও মেয়ে… হ্যাঁ, তুমি তো খুব ভালো মালিশ করো… এদিকটাও আরেকটু… ওহো! খুব আরাম পাচ্ছি।”
কেন বাড়ছে বিতর্ক
এই ভিডিও সামনে আসার পর মূল প্রশ্ন উঠছে— স্কুল কি শিশুদের শেখার জায়গা, নাকি শিক্ষকের ব্যক্তিগত আরামের স্থান? সমালোচকদের বক্তব্য, ছোটদের দিয়ে এভাবে শারীরিক সেবা করানো শিশু-অধিকারের পরিপন্থী। ভিডিওতে কয়েকজন পড়ুয়াকে ভয়মিশ্রিত ভঙ্গিতে বা আদেশ মেনে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে বলেও দাবি উঠেছে। এর ফলে গোটা ঘটনাকে শুধু ‘অশোভন’ নয়, বরং ‘অমানবিক’ বলেও বর্ণনা করছেন অনেকে।
আরও অভিযোগ, পড়াশোনার সময়কে ব্যবহার করে এই ধরনের ব্যক্তিগত কাজ করানো হলে তা শিক্ষাব্যবস্থার মর্যাদাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। একজন প্রধান শিক্ষিকার কাছ থেকে যেখানে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং শিশু-সংবেদনশীল আচরণ প্রত্যাশিত, সেখানে ভাইরাল ভিডিওর দৃশ্য সম্পূর্ণ উল্টো বার্তা দিচ্ছে।
প্রশাসনিক অবস্থান
ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলেও, এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তরফে আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা দফতরের পক্ষ থেকে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে খবর। তদন্তে ভিডিওর সত্যতা, ঘটনার সময়, উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হতে পারে।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, স্কুলে পাঠানো শিশু যদি শিক্ষা নেওয়ার বদলে এমন কাজে বাধ্য হয়, তাহলে তা শুধু অনৈতিক নয়— ভবিষ্যতে শিশুদের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে ভয়, অবিশ্বাস বা মানসিক অস্বস্তিও তৈরি করতে পারে।
বড় প্রশ্নগুলো
এই ঘটনাকে ঘিরে কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে— শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত নজরদারি আছে কি? স্কুল পরিচালন ব্যবস্থায় অভিযোগ জানানোর কার্যকর পদ্ধতি কতটা সক্রিয়? এবং সবথেকে বড় কথা, শিশুদের মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসন কত দ্রুত ও কতটা কড়া পদক্ষেপ নেবে?
ভাইরাল ভিডিও ঘিরে বিতর্ক যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে— এটি শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন ভিডিও নয়, বরং স্কুল ব্যবস্থার ভেতরে জবাবদিহি, নৈতিকতা এবং শিশু-অধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
