আমেরিকা–ইজরায়েল–ইরান সংঘর্ষে সবচেয়ে বড় চাপ কি ভারতের উপর? ১০ দিনে ৩১ লক্ষ কোটি ক্ষতি, তেল ও বাজার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা, ইজরায়েল ও ইরানের সংঘর্ষ সামরিক উত্তেজনার গণ্ডি ছাড়িয়ে জ্বালানি বাজার, শেয়ার বাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও বড় প্রভাব ফেলছে। সরাসরি যুদ্ধে না থেকেও ভারতের অর্থনীতি এই সংঘর্ষের অভিঘাতে বড় চাপের মুখে পড়তে পারে বলে একাধিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপর আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলার পর শুরু হয় পাল্টা আক্রমণ। সেই সংঘর্ষের প্রভাব কুয়েত, সৌদি আরব এবং বাহরিন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। DailyBangla-র আন্তর্জাতিক বিভাগে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা নিয়ে ধারাবাহিক কভারেজ রয়েছে। একইভাবে Iran Drone Attack সংক্রান্ত প্রতিবেদনে আঞ্চলিক বিস্তারও উঠে এসেছে। বাজারে তার অভিঘাত নিয়ে ফাইন্যান্স রিপোর্ট-এ আলাদা বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে।
এই সংঘর্ষে আমেরিকা, ইজরায়েল এবং ইরান সরাসরি জড়িত হলেও অর্থনৈতিক অভিঘাতের দিক থেকে ভারতও বড় ঝুঁকির মুখে। ১০ দিনে ভারতের শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ৩১ লক্ষ কোটি টাকা বাজারমূল্য উধাও হওয়ার দাবি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে তেলের দাম বাড়লে পেট্রোল-ডিজেল থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
আমেরিকার সামরিক খরচ কতটা বেড়েছে
রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে “অপারেশন এপিক ফিউরি” চালাতে আমেরিকা একদিনেই প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। এর মধ্যে হামলায় খরচ হয়েছে ৭,২০০ কোটি টাকা এবং প্রস্তুতিতে ৫,৮০০ কোটি টাকা।
দ্বিতীয় দিন থেকে পরবর্তী ১০০ ঘণ্টায় মার্কিন সামরিক ব্যয় দৈনিক প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে ৮,৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম সপ্তাহেই মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫,২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৬,৮০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে ইরানের হামলা প্রতিহত করতে।
আমেরিকার যুদ্ধ ব্যয়ের প্রধান তথ্য
- একদিনের সামরিক ব্যয় প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা
- প্রথম সপ্তাহে মোট ব্যয় প্রায় ৫৫,২০০ কোটি টাকা
- ইরানের হামলা প্রতিহত করতে খরচ হয়েছে ৩৬,৮০০ কোটি টাকা
- একটি Tomahawk মিসাইলের দাম প্রায় ১৮.৫ কোটি টাকা
- ৪০০টি মিসাইল লঞ্চে খরচ হয়েছে প্রায় ৭,৩৬০ কোটি টাকা
আমেরিকা এই যুদ্ধে B-2, B-52, B-1B, F-35, MQ-9 Reaper ড্রোন, HIMARS এবং Tomahawk ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করছে। পাশাপাশি USS Gerald R Ford এবং USS Abraham Lincoln-সহ দুটি Aircraft Carrier Strike Group মোতায়েন করা হয়েছে। একটি Strike Group পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৮৩ কোটি টাকা খরচ হয়।
ইরানের হামলায় কাতারের আল-উদেইদ বেসে একটি সতর্কতা রাডার ধ্বংস হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১০,১১৮ কোটি টাকা। UAE-তে থাকা একটি THAAD-2 রাডার ধ্বংস হয়ে ক্ষতি হয়েছে ৪,৬০০ কোটি টাকা। কুয়েতে তিনটি F-15 Strike Eagle জেট ধ্বংস হয়েছে, যার দাম প্রায় ২,৭৬০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে প্রায় ১৮,৪০০ কোটি টাকার মার্কিন সামগ্রী নষ্ট হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি।
বিশ্লেষকদের অনুমান, যুদ্ধ ২ সপ্তাহ চললে আমেরিকার ক্ষতি ৯২,০০০ কোটি থেকে ১ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। এক মাস টানলে এই খরচ সাড়ে ৪ লক্ষ কোটি টাকা ছুঁতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন শেয়ার বাজার থেকেও প্রায় ৮৩ লক্ষ কোটি টাকা উধাও হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইজরায়েলের খরচ ও অর্থনৈতিক চাপ
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে “রোরিং লায়ন” অভিযান শুরু করার পর থেকে ইজরায়েলের সামরিক ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই অভিযানের সাপ্তাহিক খরচ প্রায় ২৭,৫০০ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৬,৬৫২ কোটি টাকা সামরিক খরচ হচ্ছে।
ইজরায়েলের যুদ্ধ ব্যয়ের প্রধান তথ্য
- সামরিক বাজেট প্রায় ৪ লক্ষ ৩২ হাজার কোটি টাকা
- সাপ্তাহিক সামরিক ব্যয় প্রায় ২৭,৫০০ কোটি টাকা
- এখন পর্যন্ত মোট খরচ প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা
- ৩ থেকে ৪ লক্ষ রিজার্ভ সেনা সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন
- শেয়ার বাজারে ক্ষতি প্রায় ২ লক্ষ ২০ হাজার কোটি থেকে আড়াই লক্ষ কোটি টাকা
তেল আভিভ-সহ বিভিন্ন এলাকায় ইরানের পাল্টা আক্রমণে ক্ষতি হয়েছে আবাসিক ভবন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং শিল্প অবকাঠামোর। যুদ্ধের কারণে ব্যবসা, স্কুল, বিমান চলাচল এবং পর্যটন ব্যাহত হয়েছে। ইজরায়েলের অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, মাত্র এক সপ্তাহেই প্রায় ২৭,৫০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে পুনর্গঠনের জন্য কয়েক লক্ষ কোটি টাকা খরচ হতে পারে এবং মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি সাড়ে ৪ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি পৌঁছাতে পারে বলে বিশ্লেষকদের অনুমান।
ইরানের ক্ষতি কোথায় সবচেয়ে বেশি
ইরানের সুপ্রিম লিডার আলি খামেনির মৃত্যুর খবর এই সংঘর্ষে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনাগুলির একটি হিসেবে সামনে এসেছে। তবে আর্থিক দিক থেকে ইরানের ক্ষতির চিত্র কিছুটা ভিন্ন। যুদ্ধের আগে থেকেই দেশটি আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপে ছিল।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের সামরিক বাজেট প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা। সস্তা ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহারের কারণে তুলনামূলক কম বাজেটেও ইরান এই যুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে রয়েছে। Shahed-136 ড্রোনের দাম মাত্র ৩২ লক্ষ টাকা, Fateh-110 মিসাইলের দাম প্রায় ৪.৫ কোটি টাকা এবং Sejjil মিসাইলের দাম প্রায় ১০ কোটি টাকা।
ইরানের ক্ষতির পরিসংখ্যান
- সামরিক বাজেট প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা
- ১০ দিনে তেল রপ্তানি ক্ষতি প্রায় ১১,৬০০ কোটি টাকা
- মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ৩৬,০০০ কোটি টাকা
- শেয়ার বাজারে ক্ষতি প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা
যুদ্ধের আগে ইরান প্রতিদিন প্রায় ১৭ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮০ ডলার, অর্থাৎ দৈনিক আয় প্রায় ১,২৪০ কোটি টাকা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উৎপাদন কমে প্রায় ১ লক্ষ ব্যারেলে নেমে এসেছে, ফলে দৈনিক আয় নেমে হয়েছে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা।
আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলায় ইরানে প্রায় ১,৩০০ জন সাধারণ মানুষ ও সৈন্য নিহত হয়েছেন এবং ১৫৩টি শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেল শোধনাগার, গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, সামরিক ঘাঁটি, ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্গঠনে প্রায় ৪৫,৯০০ কোটি টাকা লাগতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
ভারতের উপর চাপ কতটা বাড়তে পারে
এই সংঘর্ষে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ভারতের অর্থনৈতিক ঝুঁকি। কারণ ভারত সরাসরি যুদ্ধে নেই, তবু জ্বালানি আমদানি, শেয়ার বাজার, রপ্তানি এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের কারণে পরিস্থিতির অভিঘাত বড় আকার নিতে পারে।
গত ১০ দিনে ভারতের শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ৩১ লক্ষ কোটি টাকা বাজারমূল্য গায়েব হয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮১ ডলার থেকে বেড়ে ১১৪ ডলার-এ পৌঁছেছে। IRGC-র বক্তব্য অনুযায়ী, সেই দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও সামনে এসেছে।
ভারতের জন্য মূল ঝুঁকিগুলি
- গত ১০ দিনে শেয়ার বাজারে ক্ষতি প্রায় ৩১ লক্ষ কোটি টাকা
- ভারত প্রতিদিন ২.৫ থেকে ২.৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমদানি করে
- তেলের দাম ১ ডলার বাড়লে ভারতের অতিরিক্ত খরচ হয় প্রায় ১৬,০০০ কোটি টাকা
- ১৪.২ কেজি LPG সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা বেড়েছে
- ১৯ কেজি কমার্শিয়াল সিলিন্ডারের দাম ১১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে
- ভারতের ১৭% রপ্তানি মধ্যপ্রাচ্যগামী
- প্রায় ১ কোটি ভারতীয় ওই অঞ্চলে কাজ করেন
ভারতের প্রায় ৬০ শতাংশ জ্বালানি আসে ইরাক, সৌদি আরব, কুয়েত এবং UAE-সহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে। ফলে এই অঞ্চলে সংঘর্ষ বাড়লে পেট্রোল, ডিজেল, LPG, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়তে পারে।
রপ্তানির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভারত ২০২৫ সালে UAE-তে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের iPhone রপ্তানি করেছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তিগত পণ্য রপ্তানি করে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতা বাড়লে এই রপ্তানিতেও প্রভাব পড়তে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আপাতত রাশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে তেল সরবরাহ এবং ভারতের নিজস্ব মজুত পরিস্থিতিকে কিছুটা সামলাচ্ছে। তবে সংঘর্ষ দীর্ঘ হলে তেলের দাম, রেমিট্যান্স, রপ্তানি এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যবৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই চাপ আরও বাড়তে পারে।
প্রশ্নোত্তর
এই সংঘর্ষে ভারতের উপর এত বড় প্রভাব কেন পড়তে পারে?
তেলের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
ভারতের শেয়ার বাজারে ৩১ লক্ষ কোটি টাকার ক্ষতির দাবি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ভারতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোনটি?
সারকথা: আমেরিকা, ইজরায়েল এবং ইরানের এই সংঘর্ষের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্যে হলেও তার আর্থিক অভিঘাত ভারতের উপরও পড়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। শেয়ার বাজারে ৩১ লক্ষ কোটি টাকার ধাক্কা, তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা, LPG-র মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যগামী রপ্তানি এবং প্রায় ১ কোটি ভারতীয় কর্মীর ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে এই সংঘর্ষ ভারতের অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
