মোবাইল রিচার্জের খরচ আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে বলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্র সরকার মোবাইল ডেটা ব্যবহারের উপর নতুন করে কর বসানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বলে জানা গিয়েছে। এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি ঠিকই, তবে প্রস্তাব কার্যকর হলে মধ্যবিত্তের মাসিক খরচে বড়সড় চাপ পড়তে পারে।
কেন বাড়ছে উদ্বেগ?
এখনকার দিনে ইন্টারনেট আর বিলাসিতা নয়, বরং দৈনন্দিন প্রয়োজন। ভিডিও দেখা, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল পেমেন্ট, অফিসের কাজ, এমনকি সাধারণ যোগাযোগের ক্ষেত্রেও মোবাইল ডেটা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে যদি মোবাইল ডেটা ব্যবহারের উপর নতুন কর বসে, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটেই।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সস্তা মোবাইল ডেটা ব্যবহারকারী দেশ। আর সেই কারণেই দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডেটা ব্যবহার করছেন। এই দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল ব্যবহারের দিকেই এবার নজর দিয়েছে কেন্দ্র সরকার।
বৈঠকে উঠল নতুন করের প্রস্তাব
সম্প্রতি টেলিকম খাত নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মোবাইল ডেটা ব্যবহারের উপর নতুন কর বসানোর বিষয়টি আলোচনায় ওঠে। জানা গিয়েছে, এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মূলত দেশের দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল অর্থনীতি থেকে কীভাবে নতুন উপায়ে সরকারি রাজস্ব বাড়ানো যায়, সেই দিক নিয়েই আলোচনা হয়।
এর পর টেলিকম মন্ত্রকের অধীনস্থ ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমিউনিকেশনকে এই বিষয়ে বিস্তারিত সমীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে খবর। প্রাথমিক পর্যায়ে যে ভাবনা সামনে এসেছে, তাতে মোবাইল ডেটা ব্যবহারের উপর প্রতি ১ জিবিতে ১ টাকা করে কর বসানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।
সহজ করে বুঝুন
- মোট মোবাইল ডেটা ব্যবহার: ২২৯ বিলিয়ন জিবি
- সম্ভাব্য নতুন কর: প্রতি ১ জিবিতে ১ টাকা
- সম্ভাব্য অতিরিক্ত সরকারি আয়: প্রায় ২২,৯০০ কোটি টাকা বছরে
সরকারের হিসাব কী বলছে?
আলোচনায় উঠে আসা হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতে মোট মোবাইল ডেটা ব্যবহার হয়েছে প্রায় ২২৯ বিলিয়ন জিবি। এই ব্যবহারের উপর যদি প্রতি জিবিতে ১ টাকা করে কর আরোপ করা হয়, তাহলে বছরে সরকার অতিরিক্ত প্রায় ২২,৯০০ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব পেতে পারে।
২৪৯ বা ২৯৯ টাকার প্ল্যানে কতটা বাড়তে পারে খরচ?
এবার সাধারণ ব্যবহারকারীর উদাহরণে বিষয়টি বোঝা যাক। ধরুন, আপনি এমন একটি রিচার্জ প্ল্যান ব্যবহার করেন যেখানে প্রতিদিন ২ জিবি করে ডেটা পাওয়া যায়। সাধারণভাবে এই ধরনের প্ল্যানে মাসে প্রায় ৬০ জিবি ডেটা ব্যবহারের সুযোগ থাকে।
সেক্ষেত্রে যদি প্রতি জিবিতে ১ টাকা করে নতুন কর বসে, তাহলে আপনার মাসিক খরচে প্রায় ৬০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি চাপ পড়তে পারে। অর্থাৎ, আজ যে ২৪৯ টাকার প্ল্যান ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি বেড়ে ৩০০ থেকে ৩১০ টাকার আশেপাশে পৌঁছে যেতে পারে। একইভাবে ২৯৯ টাকার প্ল্যানেও প্রায় একই পরিমাণ অতিরিক্ত খরচ যোগ হতে পারে।
সম্ভাব্য প্রভাব
- প্রতিদিন ২ জিবি ডেটা প্ল্যান = মাসে প্রায় ৬০ জিবি
- প্রতি জিবিতে ১ টাকা কর = মাসে প্রায় ৬০ টাকা বাড়তি চাপ
- ২৪৯ টাকার প্ল্যান যেতে পারে ৩০০-৩১০ টাকার ঘরে
- ২৯৯ টাকার প্ল্যানও আরও ৬০ টাকা মতো দামি হতে পারে
এখনও তো ১৮ শতাংশ GST দিচ্ছেন গ্রাহকেরা
এক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বর্তমানে মোবাইল রিচার্জের উপর গ্রাহকদের এমনিতেই ১৮ শতাংশ GST দিতে হয়। ফলে নতুন কর চালু হলে সেটি এই জিএসটির সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে যুক্ত হবে। অর্থাৎ, মোবাইল পরিষেবার মোট খরচ ধাপে ধাপে আরও বেড়ে যেতে পারে।
এতে শুধু প্রিপেইড গ্রাহকেরাই নয়, ভারী ডেটা ব্যবহারকারী পরিবার, ছাত্রছাত্রী, ফ্রিল্যান্সার, ছোট ব্যবসায়ী এবং যাঁদের কাজ অনেকটাই ইন্টারনেটনির্ভর, তাঁদের উপরও প্রভাব পড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে কার উপর?
- যাঁরা প্রতিদিন বেশি মোবাইল ডেটা ব্যবহার করেন
- অনলাইন ক্লাস বা পড়াশোনার জন্য মোবাইল ডেটার উপর নির্ভরশীল ছাত্রছাত্রী
- ওয়ার্ক ফ্রম হোম বা ফিল্ডওয়ার্কে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কর্মীরা
- একাধিক সিম বা পরিবারের একাধিক রিচার্জ সামলাতে হয় এমন মধ্যবিত্ত পরিবার
- ভিডিও স্ট্রিমিং, গেমিং ও সোশ্যাল মিডিয়া বেশি ব্যবহারকারীরা
এখনই কি দাম বাড়ছে?
না, আপাতত তেমনটা নয়। এই প্রস্তাব এখনও শুধু আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সরকার এখনো এই নতুন কর কার্যকর করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে Jio, Airtel বা অন্য কোনও টেলিকম সংস্থার রিচার্জ প্ল্যানে এখনই পরিবর্তন হচ্ছে— এমনটা বলা যাচ্ছে না।
তবে যদি প্রস্তাবটি ভবিষ্যতে অনুমোদন পায়, তাহলে মোবাইল রিচার্জের খরচে নতুন চাপ পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই এই বিষয়ে পরবর্তী সরকারি আপডেটের দিকেই নজর থাকবে সাধারণ মানুষের।
